Subscribe Us

Friday, February 6, 2026

সবুজ ক্যাম্পাসে এক অসমাপ্ত প্রেমের স্বপ্ন

 


সবুজ পাতার ফাঁক গলে বিকেলের নরম আলো এসে পড়েছে ক্যাম্পাসের পুরনো কাঠের বেঞ্চটায়। বেঞ্চে বসে থাকা মেয়েটির নাম আরশি রহমান। হালকা কমলা রঙের সালোয়ার-কামিজে সে যেন চারপাশের সবুজের সঙ্গে মিশে গেছে। লম্বা চুল কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে, চোখে শান্ত দৃঢ়তা—যেন জীবন তাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে।

আরশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। গ্রাম থেকে উঠে আসা এই মেয়েটির স্বপ্ন ছিল একদিন নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়া—কারও ছায়া হয়ে নয়।

আরশির শৈশব কেটেছে উত্তরবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক, মা গৃহিণী। টাকার অভাব ছিল, কিন্তু স্বপ্নের অভাব ছিল না। বাবা প্রায়ই বলতেন,
“মা, মানুষ মরার পর সম্পদ রেখে যায় না, রেখে যায় শিক্ষা।”

এই কথাটা আরশির হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছিল।

কলেজে পড়ার সময় সে টের পেয়েছিল—মেয়েদের স্বপ্ন দেখা এখনো অনেকের চোখে অপরাধ। আত্মীয়স্বজন বলত,
“এত পড়াশোনা করে কী হবে? শেষে তো সংসারই করবে।”

আরশি চুপ করে থাকত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে নিজেকে শক্ত করত।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিনেই তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল ইমরান হাসান–এর। ইমরান অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র। চোখে চশমা, মুখে মৃদু হাসি, কথায় ভীষণ সংযত। প্রথম পরিচয়টা হয়েছিল লাইব্রেরিতে—একই বইয়ের জন্য দুজনের হাত একসঙ্গে এগিয়ে গিয়েছিল।

হালকা লজ্জা আর অদ্ভুত এক অনুভূতি নিয়ে আরশি বইটা ছেড়ে দিয়েছিল।
ইমরান বলেছিল,
“তুমি নাও, আমি পরে পড়ব।”

এই ছোট্ট সৌজন্যই আরশির মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিল।

দিন গড়াতে তাদের বন্ধুত্ব গভীর হতে থাকে। ক্যাম্পাসে হাঁটা, লাইব্রেরিতে একসঙ্গে পড়া, চায়ের দোকানে সমাজ নিয়ে তর্ক—সবকিছুতেই এক অদ্ভুত মানসিক মিল ছিল।

ইমরান স্বপ্ন দেখত দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার।
আরশি স্বপ্ন দেখত নারী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করার।

একদিন কৃষ্ণচূড়ার নিচে বসে ইমরান বলেছিল,
“জানো, আরশি—তুমি কথা বললে মনে হয় ভবিষ্যৎটা খুব সম্ভব।”

আরশি হাসলেও বুকের ভেতর কেমন করে উঠেছিল।

কিন্তু জীবন সব সময় মসৃণ পথে চলে না।

তৃতীয় বর্ষের মাঝামাঝি সময় আরশির বাবার স্ট্রোক হলো। সংসারের হাল ধরতে হলো তাকেই। টিউশনি, পার্টটাইম কাজ—সব একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে পড়াশোনায় চাপ পড়ল।

এক সেমিস্টারে ফল খারাপ হলো।

ডিপার্টমেন্টের অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিল। কেউ কেউ কটাক্ষ করল,
“গ্রাম থেকে আসলে এমনই হয়।”

আরশি ভেঙে পড়েছিল।

সেই সময় ইমরানই ছিল তার ভরসা।
একদিন ক্যাম্পাসের নির্জন বেঞ্চে বসে আরশি কাঁদছিল।
ইমরান শুধু বলেছিল,
“একটা ফলাফল তোমাকে সংজ্ঞায়িত করে না। তুমি পারবে—আমি জানি।”

এই বিশ্বাসটাই আরশির শক্তি হয়ে দাঁড়াল।

কিন্তু ঠিক তখনই ইমরানের জীবনে এল মোড় ঘোরানো সুযোগ—বিদেশে স্কলারশিপ। আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে ভয়ও কাজ করছিল তার মনে।

বিদায়ের আগের দিন ইমরান বলেছিল,
“আমি ফিরব, আরশি। নিজেকে গড়ে তুলে ফিরব।”

আরশি কিছু বলেনি। শুধু চোখে জমে থাকা আবেগ লুকিয়ে রেখেছিল।

ইমরান চলে যাওয়ার পর আরশি নিজেকে কাজে ডুবিয়ে দিল। পড়াশোনা, গবেষণা, সমাজকর্ম—সবকিছুতেই সে নিজের সীমা ছাড়িয়ে গেল। বস্তির শিশুদের জন্য একটি ছোট শিক্ষা প্রকল্প শুরু করল।

শেষ বর্ষে এসে সে বিভাগের সেরা ছাত্রী হলো।

একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে তাকে বলা হলো—
“আরশি রহমান আজ শুধু একজন শিক্ষার্থী নয়, সে এক অনুপ্রেরণা।”

দুই বছর পর, এক বর্ষার দিনে ইমরান ফিরে এল।

ক্যাম্পাসের সেই পুরনো বেঞ্চে আবার দেখা।
সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে আলো পড়ছে—ঠিক আগের মতোই।

ইমরান বলল,
“তুমি বদলাওনি, শুধু আরও দৃঢ় হয়েছ।”

আরশি মৃদু হেসে বলল,
“স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছি।”

তাদের প্রেম ছিল প্রতিশ্রুতির নয়, ছিল পারস্পরিক সম্মান আর সমর্থনের। তারা জানত—ভালোবাসা মানে একে অপরকে আটকে রাখা নয়, বরং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়া।

শেষ কথা

আরশির জীবন শেখায়—
ভালোবাসা তখনই সুন্দর হয়, যখন তা স্বপ্নের পথে বাধা না হয়ে শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
আর শিক্ষা—সে তো আলো, যা প্রেমকেও পথ দেখায়।

<<<<সমাপ্ত>>>>



No comments:

Post a Comment

Powered by Blogger.

Search This Blog

Lorem Ipsum is simply dummy text of the printing and typesetting industry. Lorem Ipsum has been the industry's.

Facebook