Subscribe Us

Monday, October 13, 2025

🌾 মেঠোপথে তোমার অপেক্ষা


গ্রামের ভোরটা তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। পূর্ব দিগন্তে সূর্য লালচে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে ধানক্ষেতের ওপরে। বাতাসে আছে কাঁচা ঘাসের গন্ধ, দূরে পাখির দল উড়ছে আকাশে। সেই ভোরে, মাটির পথের ধারে সবুজ ঘাসের ওপর বসে আছে রোদে স্নান করা এক মেয়ে—রোদেলা।

রোদেলার গায়ে হালকা হলুদ রঙের সেলোয়ার কামিজ, মাথায় ঘাসের মতো সবুজ ওড়না। মুখে মিষ্টি হাসি, চোখে যেন এক টুকরো শান্তি। সে বসে আছে পথের ধারে, যেন কারো অপেক্ষায়।

রোদেলা পাশের গ্রামের মেয়ে। ক্লাস টুয়েলভে পড়ে। বাবা গ্রামের স্কুলের শিক্ষক, মা গৃহিণী। ছোট্ট পরিবার হলেও তাদের জীবনে সুখের অভাব নেই। রোদেলা শান্ত-সরল, গ্রামের মেয়েদের মতো পর্দা করে, কিন্তু মনটা তার একদম খোলা আকাশের মতো। বই, গান আর প্রকৃতি—এই তিনটাকেই সে ভালোবাসে।

প্রায় এক বছর ধরে রোদেলার জীবনে এসেছে এক নতুন মানুষ—আরিফ। পাশের গ্রামে থাকে সে, কলেজে পড়ে, শহরে যাতায়াত করে। রোদেলার সাথে তার দেখা হয় একদিন গ্রামের হাটে। রোদেলা তখন মা’য়ের সঙ্গে গিয়েছিল সবজি কিনতে, আরিফ বই কিনতে। বইয়ের দোকানে রোদেলার চোখ পড়ে রবীন্দ্রনাথের “চোখের বালি” তে, আরিফও তাকিয়ে আছে একই বইয়ের দিকে।

দুজনের হাত একসাথে পড়ে বইয়ের মলাটে। ছোট্ট এক ছোঁয়া, লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যায় রোদেলার। আরিফ হেসে বলে,
— “তুমি নাও আগে, আমি পরে কিনব।”
রোদেলা কিছু না বলেই বইটা নেয়, তবে ফেরার পথে বুঝতে পারে—ওর জীবনে কিছু একটা নতুন শুরু হলো আজ।

তারপর ধীরে ধীরে দুজনের দেখা হতে থাকে গ্রামের পাঠাগারে, স্কুলের সামনে, কিংবা নদীর পাড়ে। তারা কথা বলে বই নিয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে, আবার কখনও নিঃশব্দে একে অপরের চোখে তাকিয়েরোদেলার মনে হয়, এই ছেলেটার চোখে সত্যিই মায়া আছে।

তবু গ্রামে প্রেম লুকিয়ে রাখা কঠিন। রোদেলার বান্ধবীরা টের পেয়ে যায়, কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলে,
— “তোর সেই বইওয়ালা ছেলেটা আজ আবার এসেছে হাটে!”
রোদেলা শুধু মুচকি হাসে।

একদিন বিকেলে, রোদেলা ঠিক এমনইভাবে মাটির রাস্তায় বসে ছিল। হালকা বাতাসে তার ওড়না উড়ছে, সূর্য অস্ত যাচ্ছে পশ্চিমে। ঠিক তখনই আরিফ আসে সাইকেল চালিয়ে। তার গলায় ঝুলছে ব্যাগ, চোখে সেই চেনা ভালোবাসা।

— “রোদেলা, আজ আমি চলে যাচ্ছি ঢাকায়। ভর্তি পরীক্ষা আছে সামনে।”
রোদেলা চমকে তাকায়, ঠোঁট কাঁপে—
— “এত তাড়াতাড়ি? কিছু না বলেই চলে যাচ্ছ?”
আরিফ মৃদু হেসে বলে,
— “বলতে না চেয়েছিলাম, কিন্তু তোমায় না বলে থাকা গেল না। আমি চেয়েছি, আমার স্বপ্নের পথে তুমি থাকো, পাশে থেকো।”

রোদেলার চোখে জল আসে। সে বলে,
— “তুমি চলে গেলে এই পথটা একদম ফাঁকা হয়ে যাবে।”
আরিফের কণ্ঠ কাঁপে,
— “ফিরে আসব, শুধু অপেক্ষা করো। আমি চাইলেও তোমাকে ফেলে যেতে পারব না।”

তারপর দুইজনের নীরব বিদায়। সেদিনের মতো সূর্য ডুবেছিল, কিন্তু রোদেলার জীবনে এক নতুন অন্ধকার নেমে আসে।

দিন যায়, মাস যায়। আরিফের খবর আসে মাঝেমাঝে—মোবাইল ফোনে ছোট্ট মেসেজ, কখনও কল। সে জানায়, ঢাকায় ভর্তি হয়েছে মেডিকেলে। পড়াশোনার চাপ, কিন্তু রোদেলার কথা ভুলে যায়নি।

অন্যদিকে গ্রামের মানুষজন রোদেলার বিয়ে নিয়ে কথা বলা শুরু করে। মা-বাবাও চিন্তায় পড়ে যায়, কিন্তু রোদেলা একটাই কথা বলে,
— “আমি এখন বিয়ে করব না, আগে পড়াশোনা শেষ করি।”
বাবা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলে না।

দুই বছর কেটে যায়। রোদেলা কলেজ শেষ করে ভর্তি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। সময় বদলায়, তবে রোদেলার সেই সবুজ ওড়না আর তার প্রতীক্ষা বদলায় না। মাঝে মাঝে সে ঠিক আগের মতোই বসে থাকে মেঠোপথে, আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে—“আরিফ এখন কেমন আছে?”

একদিন হঠাৎ বিকেলে, ঠিক সেই পুরোনো জায়গায়, বাতাসে আবার ভেসে আসে চেনা সাইকেলের ঘণ্টা। রোদেলা মাথা তোলে—দেখে, আরিফ দাঁড়িয়ে আছে, আগের মতোই হাসছে।

— “তুমি ফিরে এসেছো?”
— “হ্যাঁ, এবার স্থায়ীভাবে। ডাক্তার হয়েছি, এখন তোমার পাশে থাকব।”

রোদেলার চোখে জল টলমল করে, কিন্তু মুখে হাসি।
সে বলে,
— “তুমি জানো, আমি এই জায়গাতেই প্রতিদিন বসে থাকতাম। ভাবতাম, একদিন হয়তো তুমি আসবে।”
আরিফ মৃদু হেসে বলে,
— “আমি জানতাম তুমি অপেক্ষা করবে। তাই তো ফিরেছি ঠিক এখানে।”

সেদিন বিকেলের আকাশে আবার পাখিরা উড়ছিল, ঠিক যেমনটা সেই প্রথম দেখা দিনের মতো। রোদেলা আর আরিফ একসাথে হেঁটে চলে গেল মাটির রাস্তাটা ধরে, চারপাশে সবুজ ধানক্ষেত, গাছের পাতায় বাতাসের খেলা।

গ্রামের মানুষ তাকিয়ে দেখে—দুইজন মানুষ, যারা ভালোবাসাকে শুধু কথায় নয়, অপেক্ষায় বেঁচে রেখেছে।

সন্ধ্যায় সূর্য ডোবে, কিন্তু মেঠোপথে আজও আলো আছে—ভালোবাসার আলো।

🌸 শেষ কথা

রোদেলা ও আরিফের গল্পটি হয়তো খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে আছে এক বাস্তব প্রেমের গভীরতা। যেখানে প্রতিশ্রুতি মানে শুধু কথা নয়, সময়ের সঙ্গে বেঁচে থাকা এক বিশ্বাস।

তারা দুজনেই প্রমাণ করেছিল—সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও দূরত্বে হারায় না, বরং অপেক্ষার মধ্যেই আরও দৃঢ় হয়।

<><><> শেষ <><><>

No comments:

Post a Comment

Powered by Blogger.

Search This Blog

Lorem Ipsum is simply dummy text of the printing and typesetting industry. Lorem Ipsum has been the industry's.

Facebook