গ্রামের সকাল
সূর্য তখন ঠিক মাথার ওপর ওঠেনি, কিন্তু মাঠে কাজ শুরু হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে থেকেই। কাঁচা পথের ধুলায় আলোর ঝিলিক, চারদিকে ধানের গন্ধ আর নদীর হাওয়া। সেই হাওয়াতেই হাঁটছে আমেনা — সবুজ শাড়ি পরে, এক হাতে কাঁচের চুড়ি, অন্য হাতে একখানা ছোট ব্যাগ। চোখে যেন নদীর মতো গভীর শান্তি।
গ্রামের সবাই আমেনাকে চেনে। তার হাসি যেমন মিষ্টি, তেমনি কথা বলার ধরনেও একটা মায়া আছে। পাড়ার বাচ্চারা তাকে “আমেনা আপা” বলে ডাকে। সে স্কুলে পড়ায়, যদিও এখনো নিজেই কলেজে পড়ে। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে সকালে গিয়ে ছোটদের পড়ায়, বিকেলে নিজের ক্লাসে যায় শহরে।
গ্রামের অন্য মেয়েরা যখন সংসারে ব্যস্ত, আমেনা তখন বইয়ের পাতায় হারিয়ে যায়। তার বাবা রশিদ মিয়া গর্ব করে বলেন,
“আমার মেয়ে একদিন বড় হইব, শহরের অফিসে চাকরি করব!”
কিন্তু আমেনার মন তেমন শহরমুখী নয়। সে গ্রামের মাটির গন্ধেই বাঁচে, পুকুরের জলে ভেসে থাকা কচুরিপানাতেই খুঁজে পায় রঙিন স্বপ্ন।
আবিরের আগমন
একদিন বিকেলে হাট থেকে ফেরার পথে আমেনা দেখল গ্রামের রাস্তার পাশে এক অপরিচিত ছেলে সাইকেল সারাচ্ছে। গায়ে হালকা ধুলো, কিন্তু চেহারায় পরিষ্কার-সুন্দর এক শান্ত ভাব। সে সাইকেল ঠিক করতে করতে বলল,
“আপা, একটু পানি পাইতে পারি?”
আমেনা হাসল, “এত গরমে এক গ্লাস পানি না খাইলে তেষ্টা লাগবেই তো।”
পাশের দোকান থেকে পানি এনে দিল সে। তারপর জানতে পারল, ছেলেটির নাম আবির। শহর থেকে এসেছে, সরকারি প্রকল্পে গ্রামের রাস্তাঘাটের জরিপ নিতে। কিছুদিন এখানেই থাকবে।
সেই প্রথম দেখা— এক মুহূর্তের কথা, কিন্তু দুজনের হৃদয়ে যেন কিছু একটা নরমভাবে ছুঁয়ে গেল।
সম্পর্কের শুরু
পরের দিন বিকেলে আমেনা স্কুল থেকে ফিরছিল। দেখল, আবির রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একটা ছায়াঘেরা গাছের নিচে নোট লিখছে। সে হাসল,
“দেখি, আবার জরিপ নাকি কবিতা লিখছেন?”
আবির হেসে বলল,
“জরিপ লিখলেও আপনার মতো কাউকে দেখলে কবিতা হয়ে যায়।”
আমেনা লজ্জায় হালকা হেসে চলে গেল, কিন্তু মুখে লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ল।
এরপর প্রায় প্রতিদিনই তাদের দেখা হতো — কখনো স্কুলের পথে, কখনো নদীর ঘাটে, কখনো গ্রামের মোড়ে। কথার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠল এক অদ্ভুত বন্ধন। আবির শহরের ছেলে হলেও গ্রামের নিস্তব্ধতা ভালোবেসে ফেলেছিল। আর আমেনার শান্ত চোখে যেন সে খুঁজে পেল জীবনের অর্থ।
গ্রামজীবনের প্রেম
বর্ষাকাল আসছে। মাঠে পানি জমে, বাতাসে কাঁঠালের গন্ধ। আমেনা স্কুল শেষে নদীর ধারে বসে বই পড়ে, আর আবির কখনো চুপিচুপি গিয়ে পাশে বসে গল্প করে।
একদিন বৃষ্টির মধ্যে দুজনে আশ্রয় নিল এক টিনের ছাউনি দেওয়া দোকানের নিচে।
বৃষ্টি ঝরছে, গায়ে শীতল ছোঁয়া। আবির হঠাৎ বলল,
“আমেনা, আপনি জানেন, আমি এই গ্রামটা ছাড়তে চাই না।”
আমেনা অবাক হয়ে বলল,
“ছাড়বেন না মানে?”
“মানে, শহরে ফিরে গেলেও আমার মন পড়ে থাকবে এখানে, আপনার কাছে।”
আমেনা কিছু বলল না। শুধু মৃদু হাসল, চোখে জল টলমল করছিল। হয়তো সেও বুঝে ফেলেছিল— তার মনের ভিতরেও একই অনুভূতি কাজ করছে।
বাধা আসে
গ্রামের মানুষ প্রেমকে সহজভাবে নেয় না। খবর ছড়িয়ে পড়তেই নানা কানাঘুষা শুরু হলো। কেউ বলল, শহরের ছেলে মেয়েটাকে ধোঁকা দেবে। কেউ বলল, “আমেনা এমন করল কেন?”
রশিদ মিয়াও শুনলেন কথা। রাগে গলা কাঁপছিল তাঁর,
“আমেনা! শহরের ছেলেদের বিশ্বাস করা যায় না। তোকে আমি কষ্টে মানুষ করছি। এখন নাম খারাপ করবি?”
আমেনা চুপচাপ শুনল, চোখে জল, কিন্তু মুখে কোনো কথা নেই।
সেদিন রাতটা বৃষ্টিতে ভিজেছিল পুরো গ্রাম, আর আমেনার বুকেও যেন বজ্রপাত হয়েছিল।
আবিরের প্রমাণ
পরদিন সকালে আবির এল রশিদ মিয়ার বাড়িতে। মাথায় টুপি, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“চাচা, আমি আবির। আমি শহরের ছেলে, কিন্তু আপনার মেয়েকে ভালোবাসি। আমি তাকে বিয়ে করতে চাই।”
রশিদ মিয়া প্রথমে কিছু বললেন না। তারপর ধীরে ধীরে চায়ের কাপটা নামিয়ে বললেন,
“তুমি কি জানো, গ্রামের মেয়েকে বিয়ে মানে শুধু মানুষ নয়, একটা দায়িত্ব?”
আবিরের চোখে দৃঢ়তা,
“জানি চাচা। আমি আমেনাকে শুধু ভালোবাসি না, আমি তাকে সম্মান করি।”
সেই কথাটায় যেন রশিদ মিয়ার মন একটু নরম হয়ে গেল।
সুখের সকাল
বছর খানেক পর গ্রামের মসজিদের সামনে বড় আয়োজন। আমেনা সবুজ বেনারসি পরে বসে আছে — মুখে হাসি, চোখে আনন্দের অশ্রু। পাশেই আবির, পরেছে সাদা পাঞ্জাবি, কাঁধে শাল।
চারদিকে গ্রামের মানুষ, হইচই, গান আর আলো।
মোল্লা সাহেব বললেন,
“কবুল?”
আমেনা মুখ নিচু করে বলল,
“কবুল।”
মুহূর্তেই চারদিকে “আলহামদুলিল্লাহ” ধ্বনি উঠল।
রশিদ মিয়া চোখ মুছলেন। তাঁর কণ্ঠে গর্ব,
“আমার মেয়ে তার নিজের ভালোবাসার মানুষকেই পেল। আল্লাহ ওদের সুখে
রাখুন।”
ভালোবাসার পর
কয়েক মাস পরে আবির ও আমেনা গ্রামেরই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করল। সকালে দুজনে একসঙ্গে হাঁটে মাঠের রাস্তা ধরে, সবুজ শাড়ির ঝলকে ভরে ওঠে গ্রাম।
বাচ্চারা দৌড়ে এসে বলে,
“আমেনা আপা, আবির স্যার— আজ ক্লাসে গল্প বলবেন না?”
আর তারা দুজনে হাসতে হাসতে গল্প শুরু করে—
“একসময় এক মেয়ে ছিল, নাম আমেনা… যে ভালোবাসা দিয়ে সারা গ্রামের হৃদয় জিতে নিয়েছিল।”
<><>*<> সমাপ্ত <>*<><>

No comments:
Post a Comment