সমুদ্র সৈকতের বালিকা
সমুদ্র সৈকতে সূর্যাস্তের ঠিক আগে, আকাশের নীল আর কমলা রঙের
খেলা যেন প্রকৃতির রঙ তুলির নিখুঁত
চিত্রকর্ম। সেই দৃশ্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী। বয়স
প্রায় তিরিশের কাছাকাছি, তবে তাকে দেখে মনে হয় যেন সময় তার জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে। তার সৌন্দর্য যেন প্রকৃতির সঙ্গেই একাত্ম।
মেয়েটির নাম মায়া। মায়ার চুল কালো, তবে সূর্যের আলোয় চকচক করছে যেন সোনালি আভা। মাথার চুলের অগ্রভাগ সামান্য কুকড়ানো, যা বাতাসে দোল
খেয়ে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। ডান পাশের চুলের কিছু অংশ বাতাসের তালে তালে উড়ছে, যেন কোনো নৃত্যশিল্পীর তাল অনুসরণ করছে। মায়া একটি হালকা রঙের শাড়ি পরে আছে, যা তার সৌন্দর্যকে
আরও ফুটিয়ে তুলেছে। শাড়ির আঁচল ডান কাঁধ থেকে সরে গেছে, এবং সেখানে দেখা যাচ্ছে তার লাল ব্রার সরু ফিতা। সেই ফিতাটি তার সৌন্দর্যের চমৎকার একটি স্পর্শ এনে দিয়েছে।
মায়া দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের ধারে, বালুর নরম স্পর্শ তার পায়ের তলায় অনুভূত হচ্ছে। তার বা পা শক্তভাবে
বালুর উপর ভর দিয়ে দাঁড়ানো,
আর ডান পা দিয়ে বড়
বড় ঢেউয়ের সাথে খেলা করছে। ঢেউগুলো যখন তার পায়ের পাতা স্পর্শ করে ফিরে যাচ্ছে, তখন মনে হয় যেন প্রকৃতি তার সাথে মিতালি করছে। মায়ার ডান হাতে একটি সুন্দর ঘড়ি, যা সূর্যের আলোতে
ঝলমল করছে। ঘড়িটি তার ব্যক্তিত্বের মতোই অনন্য। ডান হাতে সে শাড়ির কুচি
আকড়ে ধরে রেখেছে, যেন বাতাসে তা উড়ে না
যায়।
চারপাশের মানুষজন মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার যেন সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। তার দৃষ্টি হারিয়ে গেছে দূরের সমুদ্রের দিকে। ঢেউয়ের শব্দ, বাতাসের মৃদু গুঞ্জন আর সূর্যের শেষ
আলো—সব মিলিয়ে সেই
মুহূর্ত যেন মায়ার জন্য এক স্বর্গীয় অনুভূতি।
মায়ার ঠোঁটে একটি মৃদু হাসি খেলা করছে, যা তার মনের
শান্তি এবং আনন্দের প্রতীক।
সমুদ্রের ঢেউ যেন মায়ার শৈশবের স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে আনছে। ছোটবেলায় সে তার বাবার
সাথে সমুদ্র দেখতে আসত। বাবা তাকে কাঁধে নিয়ে ঢেউয়ের কাছে দাঁড়াতেন, আর মায়া খিলখিল
করে হাসত। সেই দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি, কিন্তু সমুদ্রের কাছে এলে সেই স্মৃতিগুলো যেন নতুন করে বেঁচে ওঠে। আজকের এই সন্ধ্যাটাও ঠিক
তেমনই একটি দিন।
হঠাৎ একটি বড় ঢেউ এসে মায়ার পায়ের কাছে আছড়ে পড়ল। তার শাড়ির নিচের অংশ ভিজে গেল, কিন্তু মায়া তাতে কিছু মনে করল না। বরং সে আরও কয়েক
পা এগিয়ে গেল ঢেউয়ের দিকে। তার মনে হল যেন সমুদ্র
তাকে ডাকছে। সে ডান হাত
দিয়ে তার চুল সরিয়ে নিল, আর চুলের সেই
ছোট্ট অঙ্গভঙ্গি তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলল। চারপাশের মানুষজনের চোখ যেন তাকে অনুসরণ করছিল, কিন্তু মায়া তাতে নির্বিকার।
কিছুক্ষণ পর, মায়া বালুর উপর বসে পড়ল। তার চারপাশে ছোট ছোট শামুক আর ঝিনুক পড়ে আছে। সে একটি ঝিনুক তুলে নিল এবং তার পৃষ্ঠে আঙুল বোলাতে লাগল।
ঝিনুকটির স্পর্শ তাকে স্মরণ করিয়ে দিল তার শৈশবের একটি দিনের কথা। সেদিন সে একটি ঝিনুক
বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল, আর তার মা
বলেছিলেন, "প্রকৃতির প্রতিটি উপহারই মূল্যবান।" সেই কথাটি আজও তার মনে গেঁথে আছে।
আকাশের রঙ আরও গাঢ়
হয়ে এলো। সূর্য ধীরে ধীরে সমুদ্রের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। সেই মুহূর্তে মায়ার মনে হল, জীবনও এই সূর্যাস্তের মতো।
প্রতিটি দিন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার সৌন্দর্য থেকে যায় স্মৃতিতে। সে মনে মনে
প্রতিজ্ঞা করল, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করবে, ঠিক যেমন আজকের এই সন্ধ্যাটা উপভোগ
করছে।
হঠাৎ করেই একটি ছোট বাচ্চা দৌড়ে এসে তার পাশে বসে পড়ল। বাচ্চাটি একটি ছোট বালতি নিয়ে এসেছিল, যাতে কিছু বালি এবং শামুক ছিল। মায়া হাসি মুখে বলল, "কী করছ তুমি?"
বাচ্চাটি উত্তর দিল, "আমি আমার মা-বাবার জন্য
একটি দুর্গ বানাব।" মায়া বাচ্চাটির সরলতা দেখে অভিভূত হল। সে বলল, "তোমার
মা-বাবা নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে।"
বাচ্চাটির মুখে একগাল হাসি ফুটে উঠল। মায়া তার নিজের শৈশবের কথা ভাবতে লাগল। সে তখনও একইরকম
সরল ছিল, জীবন ছিল নিঃশঙ্ক এবং আনন্দময়। বাচ্চাটির সাথে কথা বলতে বলতে মায়ার মন আরও হালকা
হয়ে গেল।
সমুদ্রের ধারে সেই সন্ধ্যায় মায়ার সময় কাটল খুবই সুন্দরভাবে। সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও সে কিছুক্ষণ সেখানে
বসে রইল। আকাশে তারাগুলো ঝলমল করছিল, আর সমুদ্রের ঢেউগুলো
তার নিজের গল্প বলছিল। মায়ার মনে হল, প্রকৃতি সবসময়ই আমাদের সাথে কথা বলে, যদি আমরা তা শুনতে চাই।
শেষ পর্যন্ত মায়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার শাড়ির নিচের অংশ এখনও ভেজা, কিন্তু তাতে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে শেষবারের মতো
সমুদ্রের দিকে তাকাল এবং একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাঁটা শুরু করল। তার মনে হচ্ছিল, এই সন্ধ্যা এবং
সমুদ্রের সাথে কাটানো সময়টা তার জীবনের অন্যতম সুন্দর মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
সৈকত ছেড়ে যাওয়ার সময়, বাতাসে তার শাড়ির আঁচল আবার উড়ে উঠল। তার সৌন্দর্য এবং আত্মবিশ্বাস যেন প্রকৃতিরই একটি প্রতিফলন। মায়া জানত, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই বিশেষ, আর সেই মুহূর্তগুলোকে
উপভোগ করার জন্য আমাদের মন খুলে প্রকৃতির
কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়।
সমাপ্ত

Nice
ReplyDeleteSupper
ReplyDelete