বেলী ফুলের সুগন্ধর
বেলী ফুলের সুবাসে মোড়ানো এক গ্রাম ছিল, যার নাম ছিল সুগন্ধি। গ্রামের মানুষগুলো খুবই সরল, আর তাদের জীবনের প্রতিটি দিন ভরে থাকত প্রকৃতির সুধায়। গ্রামে ছিল এক রহস্যময় বাগান, যা শুধুমাত্র বেলী ফুলে ভরা। বলা হয়, সেই বাগানের সুবাস মানুষের মনে অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিত।
গ্রামের এক প্রান্তে থাকত রোহিণী, একজন তরুণী যে ফুল ভালবাসত। তার ছোট্ট কুঁড়েঘরের চারপাশে সে নিজ হাতে বেলী ফুলের গাছ লাগিয়েছিল। সে যখনই মন খারাপ করত বা একাকী বোধ করত, তখন বেলী ফুলের সুবাস যেন তার মনে শান্তির বার্তা নিয়ে আসত। রোহিণী স্বপ্ন দেখত একদিন সে এই গ্রামের সেরা মালি হবে এবং পুরো গ্রামে বেলী ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে দেবে।
একদিন সকালে রোহিণী লক্ষ্য করল, তার বাগানের বেলী ফুলগুলো অস্বাভাবিকভাবে ঝরে পড়ছে। সে বিস্মিত হয়ে ভাবল, এমন তো কখনও হয়নি। চিন্তায় অস্থির হয়ে সে গ্রামের প্রবীণ মালি ধীরেন কাকার কাছে গেল। ধীরেন কাকা গ্রামে পরিচিত ছিলেন তার অভিজ্ঞতার জন্য।
ধীরেন কাকা রোহিণীর কথা শুনে গভীরভাবে চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, "শুধু তোমার বাগানে নয়, পুরো গ্রামের বেলী ফুলে এমন সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমি মনে করি, বাগানের মাটিতে হয়তো কোনো পরিবর্তন হয়েছে। তবে এর পেছনে অন্য কোনো রহস্যও থাকতে পারে।"
রোহিণী ও ধীরেন কাকা মিলে পুরো গ্রামে বেলী ফুলের বাগান পরীক্ষা করতে লাগলেন। দেখা গেল, সব জায়গাতেই একই অবস্থা। এক রাতে রোহিণী তার ছোট্ট জানালা দিয়ে চাঁদের আলোয় দেখতে পেল, বাগানের ফুলগুলো যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি শুষে নিচ্ছে।
পরদিন সকালে সে ধীরেন কাকার কাছে এই অভিজ্ঞতার কথা বলল। ধীরেন কাকা মৃদু হেসে বললেন, "তাহলে তোমার দেখা মিথ্যা নয়। অনেক বছর আগে আমাদের গ্রামে একটি কিংবদন্তি ছিল। বলা হয়, এক রহস্যময় ব্যক্তি, যাকে সবাই 'সুবাস চোর' বলে ডাকত, সে মানুষের সুখ চুরি করতে চাইত। সে বেলী ফুলের সুবাস শুষে নিয়ে মানুষের মনকে শূন্য করে দিত। মনে হচ্ছে সেই কিংবদন্তি সত্যি হয়ে গেছে।"
রোহিণী ভয় পেলেও দমে গেল না। সে সিদ্ধান্ত নিল, এই রহস্যের সমাধান করবেই। ধীরেন কাকার সাহায্যে সে গ্রামের প্রাচীন পুঁথি ঘাঁটতে শুরু করল। সেখানে একটি মন্ত্রের কথা লেখা ছিল, যা বেলী ফুলের সুবাসকে রক্ষা করতে পারে। তবে মন্ত্রটি কার্যকর করতে হলে তাকে পূর্ণিমার রাতে সেই রহস্যময় বাগানে যেতে হবে।
পূর্ণিমার রাতে রোহিণী একা সেই বাগানে গেল। বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে মন্ত্র পাঠ করতে শুরু করল। হঠাৎ করেই একটি কালো ছায়া তার সামনে উপস্থিত হলো। সেই ছায়া ছিল 'সুবাস চোর'। সে বলল, "তুমি কেন আমাকে বাধা দিতে এসেছ? মানুষের সুখ তো নশ্বর। আমি শুধু তাদের প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিচ্ছি।"
রোহিণী দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "তুমি ভুল করছ। মানুষের সুখ প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকে। বেলী ফুলের সুবাস কেবল একটি ফুলের গন্ধ নয়, এটি আমাদের জীবনের একটি অংশ। আমি তোমাকে এটি ধ্বংস করতে দেব না।"
সুবাস চোর একটি বিকট শব্দ করে হেসে উঠল এবং বলল, "তাহলে দেখাই যাক, তোমার সাহস কতটুকু।"
রোহিণী মন্ত্র পড়া চালিয়ে যেতে লাগল। একসময় বাগানের চারপাশে সাদা আলো ছড়িয়ে পড়ল, এবং সুবাস চোর চিৎকার করতে করতে অদৃশ্য হয়ে গেল। সেই রাতের পর থেকে গ্রামের বেলী ফুল আবার আগের মতো সুবাস ছড়াতে শুরু করল।
রোহিণী গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা পেল। সে শিখল, প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে থাকার শক্তি অপরিসীম। আর বেলী ফুলের সুবাস শুধু সৌন্দর্যের নয়, এটি ছিল গ্রামবাসীর ঐক্যের প্রতীক।
------------- **< শেষ > ** -------------

No comments:
Post a Comment