Subscribe Us

Thursday, April 24, 2025

"মেঘের বৃষ্টি"


আমেরিকার মিশিগানে দীর্ঘ সাত বছর কাটানোর পর, মেঘ ঠিক করল দেশে ফিরবে। শুধু ছুটি কাটাতে নয়, বরং এবার পাকাপাকিভাবে বিয়েটা সেরে ফেলবে। মা তো গত দুই বছর ধরেই তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছেন। যেসব পাত্রীর প্রোফাইল পাঠান, তাতে একজনকেও মেঘের ভালো লাগে না—অন্তত মায়ের বর্ণনা পড়ে তো নয়ই।

মেঘ হেসে বলে,
— “
মা, তুমি কি বায়োডাটায় প্রোডাক্ট রিভিউ লিখো?”

মা রাগ করে বলেন,
— “
আমি তোর মঙ্গলের জন্য করি, হেলাফেলা করিস না। যে মেয়েটার নাম বলছি না এবার, ওকে আমি খুঁজে এনেছি নামাজির লিস্ট থেকে! একদম পারফেক্ট। ছবি তো দিচ্ছিই, আর বর্ণনা দিলাম নিজের হাতে।

খাম খুলে মেঘ একদিন একটি মেয়ের ছবি দেখে চমকে উঠল। মেয়েটির নাম ঋতু। ঢাকা মেডিকেলের ছাত্রী। মাথায় হিজাব, হাতে একটি বই ধরা। নিঃশব্দ, কোমল একটা চাহনি। ছবিতে আলাদা কোনো সাজ নেই, তবু মেয়েটির মুখে ছিল একরকমের সতেজতাযেন সদ্য বৃষ্টির পর আকাশ পরিষ্কার হয়ে উঠেছে।

মা লিখেছেন,

নরম স্বভাবের মেয়ে। খুব একটা কথা বলে না। নামাজি। তোকে কিছুতেই বিরক্ত করবে না। শুধু ভাই-বোন নাই, শালা-শালীর মজা পাবি না। কিন্তু সব পাওয়া যায় না।

এই প্রথম কোনো মেয়ের ছবির সামনে থেমে গেল মেঘ। একদৃষ্টে চেয়ে রইল ছবিটার দিকে। মা তো একে ত্যাগের মূর্তি বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু ছবির চাহনি বলে, ভেতরে যেন অন্য কিছু লুকিয়ে আছে।

দেশে ফিরে মেঘ বাড়িতে উঠল। মা আবার শুরু করলেনপাত্রীর কথা, পছন্দ-অপছন্দ, ‘ঋতুর মা কবে আসবেন দেখা করতে’, সব কিছু। মেঘ শুধু বলল,
— “
আমি ঋতুর সাথেই দেখা করতে চাই। একা।

ঋতুর সঙ্গে প্রথম দেখা হয় একটি কফিশপে। মেঘ গিয়েছিল একধরনের সংকোচ নিয়েভাবছিল খুবই নরম স্বভাবের, কম কথা বলা একজন মেয়ের সামনে বসবে। কিন্তু অপেক্ষা করছিল চমক।

ঋতু এসে সোজা বলে, — “আপনি চা খাবেন, না কফি? আমি এসপ্রেসো নেব।

মেঘ একটু থমকে গেল। এত স্পষ্ট, নির্ভার কণ্ঠস্বর?

ঋতু হাসে, — “ভাবছেন তো, আমি তো মা বর্ণনায় নীরব মূর্তি ছিলাম?”

মেঘ হেসে ফেলে।
— “
তুমি তো বিপরীত! তুমি তো... রেইনস্টর্ম!”

— “তাই তো আমার নাম ঋতু,” সে বলল।আমার মা সব ঋতুতে ঝড় টেনে আনে। হিজাব পরি ক্লাসে, বোরকা পরি বাসা থেকে বের হলেতাতে কি আমি গম্ভীর? জীবন তো একটাই।

ঋতুর মুখে ছিল আলগা আত্মবিশ্বাস। সে প্রাণ খুলে হাসে, চোখে চোখ রেখে কথা বলে। তার শরীরী ভাষায় ভয় নেই, কণ্ঠে নেই কৃত্রিমতা।

মেঘ অভিভূত হয়ে গেল। মা তাকে বলেছিলেন ঋতু মুখের ওপর কথা বলবে না। অথচ এই মেয়ে তো তার মুখের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে!

পরবর্তী কয়েকদিন মেঘ ঋতুর মধ্যে কথা হতে লাগল নিয়মিত। মেঘ বুঝে যায়, সে একটা বড় ভুল করেছিলমায়ের বর্ণনার ওপর ভরসা করে। এই মেয়ে রেইনবো, শুধু নরম বৃষ্টি নয়, রঙের ঝলকানি।

এক সন্ধ্যায়, বৃষ্টির ছাঁটে ভিজতে ভিজতে তারা হাঁটছিল ঢাকার এক গলিপথে। মেঘ বলল, — “তোমাকে দেখে আমার গল্প লিখতে ইচ্ছে করে।

— “লিখো না কেন?”

— “তুমি তো গল্পের মতো। ধরা যায় না।

ঋতু হেসে বলল, — “আমি ধরা না পড়া গল্প, নাকি মেঘের বৃষ্টি?”

— “তুমি মেঘের বৃষ্টি, আর আমি সেই মেঘ, যে ভুল করেছিল বুঝতেতোমার মতো বৃষ্টি কত প্রাণবন্ত হতে পারে।

তবে সব গল্পে বাঁধা আসে। মেঘের মা বুঝতে পারেন, তার বর্ণনারঋতুআর বাস্তবেরঋতুএক না। তিনি সন্দেহ, অনিশ্চয়তায় পড়ে যান। ছেলের গায়ে যেন কোন মায়াবিনী জড়িয়েছে!

— “ঋতুর আচরণ খুব মুক্ত-মেজাজের। তোর মতো ছেলের জন্য এমন মেয়ে ঠিক না।

মেঘ জবাব দেয় না। শুধু বলে, — “মা, তুমি যেটাকে সমস্যা ভাবছ, ওটাই তো আমার ভালো লাগার কারণ।

একদিন মা ঋতুর দেখা হয়। মা সরাসরি বলেন, — “তুই তো কথাই বলিস অনেক, ছেলেটা তো চুপচাপ…”

ঋতু হেসে বলে, — “তাই তো ভাবছি, এক জনকে তো কথা বলতেই হবে! না হলে বাসায় এত নীরবতা কে সহ্য করবে?”

মা চুপ করে যান। কিন্তু মনের ভিতর কোথাও যেন স্বস্তি বয়ে যায়। এই মেয়েটির চোখে ভয় নেই, কিন্তু অসম্মানও নেই।

বিয়েটা হয় এক বর্ষার দিনে। হালকা বৃষ্টি পড়ছে, যেন আকাশও গুনগুনিয়ে আশীর্বাদ করছে। মেঘ দাঁড়িয়ে আছে ছাদে। পাশে এসে দাঁড়ায় ঋতু।

— “বৃষ্টি ভালোবাসো?” মেঘ জিজ্ঞেস করে।

— “ভালোবাসি। তবে আমি কেবল রোমান্টিক কারণে না। বৃষ্টির সময় মাটি যেমন আলাদা গন্ধ ছাড়ে, মানুষের ভেতরের সত্যিটাও বেরিয়ে পড়ে।

— “তুমি তো সবসময় তোমার মতোই থেকেছ।

— “আসলে আমি তো চাই তুমি কখনো ভুল বুঝো নাযেমন প্রথমে বুঝেছিলে মায়ের বর্ণনা পড়ে।

মেঘ চেয়ে থাকে তার চোখের গভীরে।
— “
আমি এখন জানি, তুমি আমার জীবনের ঋতুসব ঋতুর মতো, বদলানো, রঙিন, অথচ অপরিহার্য।

শেষাংশঃ

মেঘের বৃষ্টিগল্পটা আসলে একজন মানুষের ভেতরের বাইরের রূপের মধ্যে ফারাক, সমাজের তৈরি আদর্শপ্রতিচ্ছবির বিপরীতে বাস্তবের জীবন্ত মানুষটিকে দেখার চেষ্টার গল্প। মেঘ জানে, ঋতু হয়তো সবসময় তার সাথে একমত হবে না, তার মুখের ওপরও কথা বলবে কখনো, কিন্তু সে জানে, জীবনের সব ঋতু কাটিয়ে, শেষে এই বৃষ্টির মধ্যেই শান্তি আছে।

-----------< 💔সমাপ্ত 💔> ---------


1 comment:

Powered by Blogger.

Search This Blog

Lorem Ipsum is simply dummy text of the printing and typesetting industry. Lorem Ipsum has been the industry's.

Facebook