Subscribe Us

Thursday, April 17, 2025

স্বপ্ন যখন যন্ত্রণা দেয়

"স্বপ্ন যখন যন্ত্রণা দেয়, তখন বোঝা যায়স্বপ্নটা হৃদয় ছুঁয়েছিল।"

রাত্রির শেষ প্রহর। শহরের কোলাহল অনেক আগেই নিস্তব্ধতায় বিলীন হয়েছে। আকাশে চাঁদ নেই, শুধু কয়েকটি তারা মাঝে মাঝে চোখের ইশারায় কিছু বলার চেষ্টা করছে যেন। এমন এক রাতে অনিন্দিতা নিজের ঘরে বসে চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে ছিল না ঘুম, ছিল না স্বস্তিছিল কেবল একরাশ যন্ত্রণার হাহাকার।

সে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্রী। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে একজন খ্যাতনামা লেখক হবে। বইয়ের পাতায় নাম ছাপা হবে, বইমেলায় অটোগ্রাফ দেবে, আর মানুষ বলবে—"এই মেয়েটা আমাদের সময়ের সেরা সাহিত্যিকদের একজন।"

এই স্বপ্ন সে চোখে বুনেছে, কিশোরী বয়স থেকে। রাত জেগে কবিতা লিখেছে, গল্পের খাতা সাজিয়েছে। আর সেই লেখাগুলো নিয়ে যতবার মায়ের কাছে গেছে, মা বলতেন
"
লেখালেখি করে পেট ভরে না মা, ভালো একটা চাকরি করো। লেখালেখি তো শখের ব্যাপার।"

কিন্তু অনিন্দিতা জানতো, এটা তার শখ নাতার অস্তিত্ব।

পরিবারের বাস্তবতা

বাবা মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। ছোট একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ করতেন। তার মৃত্যুর পর পুরো সংসারের ভার মা আর অনিন্দিতার কাঁধে এসে পড়ে। মা কাজ নিলেন একটা স্কুলে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে। অনিন্দিতা টিউশন করে চালিয়ে নিল নিজের খরচ। কিন্তু লেখার খাতা যেন কোনোদিন বন্ধ হয়নি।

প্রতিদিন রাতে সে একেকটা গল্প শেষ করত, প্রতিদিনই পাঠাত পত্রিকায়, অনলাইন ব্লগে। অনেক সময় কেউ উত্তরই দিত না, আবার কেউ বলত—“আপনার লেখা খুব সাধারণ।

কিন্তু একদিন, তার লেখা "শেষ পাতার মেয়েটি" নামক গল্পটা একটা স্বনামধন্য ম্যাগাজিনে ছাপা হলো। সেটাই ছিল তার জীবনের মোড় ঘোরানো মুহূর্ততখন সে বুঝল, স্বপ্ন ছুঁতে পারে বাস্তবকে, যদি তাকে ধরে রাখা যায়।

যন্ত্রণার শুরু

তবে সবকিছু বদলে গেল তার তৃতীয় বর্ষে ওঠার সময়। হঠাৎ করে মায়ের শরীর ভেঙে পড়ল। ডাক্তারের রায়: মায়ের কিডনির সমস্যা হয়েছে। নিয়মিত ডায়ালাইসিস দরকার।

অনিন্দিতা যেন বোবা হয়ে গেল। সে বুঝে গেলএখন তার স্বপ্ন অপেক্ষা করবে।

সে একে একে বন্ধ করল টিউশন, বন্ধ করল সাহিত্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া, বন্ধ করল নিজের সব ছোট ছোট খরচ।

একদিন সে লিখতে বসে দেখলকলম চলছে না। মনে হচ্ছে, ভেতর থেকে শব্দগুলো হারিয়ে গেছে।

সে খাতার পাশে লিখল

স্বপ্ন যখন যন্ত্রণা দেয়, তখন বোঝা যায়স্বপ্নটা হৃদয় ছুঁয়েছিল।

সে জানতো, যন্ত্রণা আসলে ভালোবাসার।

হঠাৎ এক চিঠি

ঠিক এমন সময় একদিন ডাকবাক্সে একটা চিঠি আসে। অনিন্দিতার গল্প "নীল জলের ওপারে" একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছে। সে দ্বিতীয় হয়েছে। পুরস্কারের অর্থপঞ্চাশ হাজার টাকা এবং একটি বই প্রকাশের সুযোগ।

অনিন্দিতা চিঠিটা পড়েও কাঁদতে পারল না। আনন্দ আর দুঃখ যেন মিশে এক হয়ে গেছে।

সে টাকাটা ব্যবহার করল মায়ের চিকিৎসায়। বই প্রকাশের সুযোগটা গ্রহণ করল না। কারণ, তার কাছে তখন তার মা সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল।

বন্ধু দীপ আর বাস্তবতার কথা

অনিন্দিতার জীবনে আরেকটা চরিত্র আছেদীপ। ওর সহপাঠী, ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দীপ সবসময় বলত
তুই যদি একদিন হাল ছেড়ে দিস, তোর স্বপ্ন একা কাঁদবে অনিন্দিতা।

কিন্তু অনিন্দিতা একদিন বলল
স্বপ্ন এখন কান্না করে না দীপ, স্বপ্ন এখন ডায়ালাইসিসের রশিদ দেখে।

দীপ কিছু বলল না, কেবল চুপ করে পাশে বসে থাকল।

আবার নতুন সূচনা

সময় গড়ায়। অনিন্দিতা এবার একটি স্থানীয় পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে চাকরি নেয়। তার লেখালেখির হাত আবার ধীরে ধীরে খুলে যেতে থাকে।

একদিন, অফিস থেকে ফেরার পথে তার মুঠোফোনে একটি কল আসে। কলকাতার এক নামকরা প্রকাশনী থেকে। তারা অনিন্দিতার আগের গল্পগুলো পড়ে মুগ্ধ হয়েছে এবং অনুরোধ করেছেসে যেন একটি গল্পসংকলন প্রকাশে রাজি হয়।

এবার সে চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে না। সে রাজি হয়। বইয়ের নাম রাখে

যন্ত্রণার চোখে স্বপ্ন

মায়ের মুখে হাসি, মেয়ের চোখে জ্যোতি

বই বের হয়। বিক্রি হয় ব্যাপকভাবে। অনিন্দিতার নাম ছড়িয়ে পড়ে পাঠকমহলে। মায়ের ডায়ালাইসিসের খরচও এখন সে সহজেই বহন করতে পারে।

একদিন বইমেলায় তার অটোগ্রাফ নিতে আসে শত শত মানুষ। এক ছোট্ট মেয়ে বলে
আপুর মত আমিও গল্প লিখতে চাই।

অনিন্দিতা মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে। তারপর বলে
লিখো মা, স্বপ্ন কখনো মরে না। শুধু সময় চায়।

শেষপাতা

রাত্রির শেষ প্রহর। জানালার পাশে বসে অনিন্দিতা আবার লেখে

স্বপ্ন যখন যন্ত্রণা দেয়, তখন বোঝা যায়স্বপ্নটা শুধু চোখে নয়, হৃদয়ে ছিল।"
আমার স্বপ্নও কেঁদেছে। কিন্তু আজ সে হাসছে। কারণ, আমি তাকে ছেড়ে যাইনি।

আকাশে আজ চাঁদ নেই, কিন্তু অনিন্দিতার মুখে আলো। কেননা, তার ভেতরের সূর্য আবার জ্বলে উঠেছে।


শেষ কথাঃ

স্বপ্ন কখনো সোজা পথে হাঁটে না। অনেক বাঁক, অনেক কাঁটা, অনেক যন্ত্রণাএসব পেরিয়েই সে পৌঁছায় গন্তব্যে। অনিন্দিতার গল্প তার প্রমাণ।

তোমারও যদি কোনো স্বপ্ন থাকেতাকে ধরে রেখো। কেননা,

যে স্বপ্ন যন্ত্রণা দেয়, সে- তোমার জীবনের সত্যিকারের স্বপ্ন।

-------- **- << সমাপ্ত >> -** ---------



1 comment:

Powered by Blogger.

Search This Blog

Lorem Ipsum is simply dummy text of the printing and typesetting industry. Lorem Ipsum has been the industry's.

Facebook