সবুজ পাহাড়ের কোলে জড়িয়ে আছে নদীটা। ঢেউ খেলানো স্রোত, যেন উচ্ছ্বাসে ভরা কিশোরীর হাসি। দূর থেকে পাহাড়ের মাথায় সাদা মেঘ এসে জড়ো হয়, তারপর ধীরে ধীরে নেমে আসে সবুজ গাছের মাথায়, যেন প্রকৃতি নিজেই আমাদের চারপাশে সাদা ওড়না মেলে দিয়েছে।
আমি তখন নৌকায় বসে। ছই-ওয়ালা পুরনো কাঠের নৌকাটি ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে নদীর বুক চিরে। মাঝি বুড়ো, কিন্তু তাঁর বৈঠার টানে নদী যেন গুনগুন করে গান গাইছে। আর আমার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে নৌকার সামনের দিকে—যেখানে বসে আছে রূপা।
রূপা—নামটাও যেন কেমন মিষ্টি, ঝরনার মতো ঝরে পড়ে। ওর লম্বা কালো চুল নদীর বাতাসে উড়ে উড়ে গালে এসে লাগে। আমি একবার ভাবলাম, হাত বাড়িয়ে চুলটা সরিয়ে দিই, কিন্তু সাহস হল না। বরং চুপচাপ তাকিয়ে থাকলাম, যেন আমার সমস্ত শব্দ হারিয়ে গেছে নদীর স্রোতে।
— “তুমি কি কখনো ভেবেছো, এই নদী কত গল্প জমিয়ে রাখে?” রূপা হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলল।
আমি একটু থমকালাম। “গল্প?”
— “হ্যাঁ… এই স্রোত বয়ে চলে, প্রতিদিন কত মানুষের জীবন দেখে, কত প্রেম, কত বিচ্ছেদ… কিন্তু কিছুই কাউকে বলে না।”
রূপার কথা শুনে মনে হল, নদীটা যেন সত্যিই নিঃশব্দে আমাদের গল্প শুনছে।
আমাদের পরিচয়ও এই নদীর ধারে। তিন মাস আগে, আমি আমার ক্যামেরা নিয়ে পাহাড়ের ছবি তুলছিলাম। হঠাৎ দেখি, একজন মেয়ে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে জল ছুঁয়ে হাসছে। আমি অবচেতনেই ক্যামেরার শাটার টিপে দিলাম। পরে বুঝলাম, ও আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলছে,
— “ছবি তুলবেন? তাহলে একটা ভালো এঙ্গেল দিন।”
সেই হাসি থেকেই শুরু। তারপর ধীরে ধীরে আমাদের দেখা হতে লাগল, কথা হতে লাগল।
নৌকা এগিয়ে চলেছে। চারপাশের পাহাড় যেন আরো কাছে চলে এসেছে। মাঝি একসময় নৌকা থামিয়ে বলল,
— “এখানে একটু নামেন, পাশেই একটা ছোট দ্বীপ আছে, খুব সুন্দর।”
আমরা নেমে পড়লাম। ছোট্ট দ্বীপের চারপাশে নদীর জল কাচের মতো স্বচ্ছ। পায়ের আঙুল ছুঁয়ে জল খেলল, আর আকাশে তখন লালচে সান্ধ্য আলো।
রূপা হঠাৎ বলল,
— “তুমি জানো, আমি শহরে ফিরতে চাই না।”
— “কেন?”
— “শহর শুধু ব্যস্ততা আর শব্দে ভরা। এখানে… এখানে সব শান্ত, সব ধীরে চলে। মনে হয়, সময়ও থেমে গেছে।”
আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম। সেখানেও নদীর মতো একধরনের গভীরতা, যা আমাকে টেনে নিচ্ছে।
আমরা দ্বীপের গাছতলায় বসে গল্প করছিলাম। বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ, দূরে পাহাড়ের মাথায় সাদা মেঘ গা ঘেঁষে বসে আছে। আমি ওর হাত ধরলাম। প্রথমে রূপা চমকে উঠল, তারপর ধীরে ধীরে হাত ছাড়াল না।
— “তুমি কি জানো, তোমার সাথে আমার প্রথম দেখা থেকেই মনে হয়েছিল… তুমি আলাদা,” আমি বললাম।
রূপা হেসে বলল, “আলাদা? কীভাবে?”
— “যেন তুমি শহরের মানুষ হয়েও গ্রামের শান্তি নিজের মধ্যে বয়ে নিয়ে এসেছো। তোমার চোখে পাহাড়ের সবুজ আছে, তোমার হাসিতে নদীর স্রোত।”
ও কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করে হাসল।
আকাশে তখন তারা উঠতে শুরু করেছে। মাঝি ডাক দিল, “বাবা, রাত হয়ে যাবে, নৌকায় ওঠেন।”
আমরা ফের নৌকায় উঠলাম। নদী তখন অন্ধকারে ঢেকে গেছে, কিন্তু মাঝি ছোট্ট লণ্ঠন জ্বালাল। সেই লণ্ঠনের আলোতে রূপার মুখ আলোকিত হয়ে উঠল। আমি মনে মনে ভাবলাম, এই মুহূর্তটা যদি চিরদিন ধরে রাখতে পারতাম!
নৌকা এগিয়ে চলল, আর আমরা চুপচাপ বসে রইলাম। মাঝে মাঝে ওর হাত আমার হাতে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। হয়তো ও ইচ্ছা করেই ছুঁচ্ছিল, হয়তো কাকতালীয়… কিন্তু তাতে আমার বুকের ভেতর ঢেউ উঠছিল।
পাহাড়ের পাদদেশে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে নৌকা থামল। নেমে আসতেই হালকা কুয়াশা নেমে এল। আমি রূপার দিকে তাকিয়ে বললাম,
— “তুমি কি কালও আসবে?”
রূপা একটু থামল, তারপর মৃদু স্বরে বলল,
— “আমি চাই, তুমি প্রতিদিন আমাকে এখানে ডাকো।”
আমি কিছু বললাম না, শুধু হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। মনে হল, এই পাহাড়, এই নদী, আর এই মেয়ে—সব মিলে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে যাবে।
সেই দিন থেকে আমরা প্রায় প্রতিদিন নৌকায় করে নদীতে যেতাম। প্রতিবারই নতুন কিছু আবিষ্কার করতাম—কখনো সাদা বক উড়ে যাওয়া, কখনো পাহাড়ের ফাঁকে বৃষ্টির জলধারা। রূপা একদিন বলল,
— “তুমি জানো, আমি ছোটবেলায় ভাবতাম নদী নাকি স্বপ্ন নিয়ে যায়।”
— “স্বপ্ন নিয়ে যায়?”
— “হ্যাঁ, রাতে যদি নদীর ধারে গিয়ে নিজের ইচ্ছে মনে মনে বলো, নদী সেটা আকাশে পৌঁছে দেয়। মেঘ সেটা বৃষ্টি বানিয়ে ফেরত পাঠায়।”
আমি হাসলাম, “তাহলে আজ রাতেই আমি আমার ইচ্ছে বলব।”
ও জানতে চাইল, “কী ইচ্ছে?”
আমি ফিসফিস করে বললাম, “তুমি।”
রূপা থমকে গেল, তারপর চুপচাপ নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। আমি ওর চোখে জল দেখতে পেলাম, কিন্তু সেটা দুঃখের নয়—বরং একধরনের শান্তি।
শরতের শেষ দিকে হঠাৎ রূপা আমাকে বলল, ওর শহরে ফিরতে হবে। আমি কিছু বলতে পারলাম না। নদীর স্রোত সেদিন অদ্ভুতভাবে ভারী লাগছিল। আমরা শেষবারের মতো নৌকায় উঠলাম। মাঝি নীরব, বাতাসও যেন থেমে গেছে।
নদীর মাঝখানে এসে রূপা আমার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
— “তুমি জানো তো, আমি ফিরলেও এই জায়গাটা আমার ভেতরে থাকবে। আর তুমি…”
ও থামল, তারপর মৃদু স্বরে বলল,
— “তুমি আমার নদী হয়ে থেকো, যেখানেই থাকি।”
আমি ওকে কিছু বলতে পারলাম না। শুধু চোখে চোখ রেখে প্রতিশ্রুতি দিলাম—যতদিন নদী বয়ে যাবে, ততদিন আমাদের গল্পও বয়ে যাবে।
-----<<>>শেষ<<>>-----

Excellent
ReplyDeleteWrite more
ReplyDelete