Subscribe Us

Tuesday, August 19, 2025

তিস্তা নদের পাড়


সন্ধ্যার নরম আলো ধীরে ধীরে তিস্তার বুকে ছড়িয়ে পড়ছিল। নদীর পানিতে সূর্যাস্তের লালচে আভা যেন এক অপরূপ রঙের খেলা তৈরি করেছিল। দূরে নৌকার দাঁড়ের শব্দ, চরে ঘাস খাওয়া গরুর ঘণ্টার মৃদু ঝংকার—সব মিলিয়ে পরিবেশটা ছিল নিস্তব্ধ অথচ স্নিগ্ধ। এই নীরব সৌন্দর্যের মাঝেই দাঁড়িয়ে ছিল অর্ণব।

অর্ণব দীর্ঘদিন পর নিজ গ্রামে ফিরেছে। শহরের কোলাহলে বহু বছর কাটালেও তার মন সবসময় টানত এই নদীর পাড়ে। ছোটবেলায় প্রতিদিন বিকেলে সে এখানে এসে বন্ধুদের সঙ্গে খেলত, কখনো আবার নিঃসঙ্গ বসে থাকত। কিন্তু আজকের ফিরে আসাটা আলাদা। কারণ শুধু নদীর জন্য নয়, এই পাড়েই সে খুঁজে পেতে চায় তার শৈশবের সেই বন্ধুটিকে—নীলাকে।

নীলা তার ছোটবেলার সাথি। কাঁচা বয়সে দু’জনের বন্ধুত্বই ছিল গ্রামের আলোচনার বিষয়। দু’জনে একসঙ্গে নদীর চরে ছুটে বেড়ানো, বর্ষার দিনে কাদা মেখে খেলা, কিংবা শীতের সকালের প্রথম রোদে বসে গোপন স্বপ্নের গল্প করা—সবই যেন অর্ণবের চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। কিন্তু সময়ের স্রোতে অর্ণব চলে গেলো শহরে পড়াশোনার জন্য। নীলা থেকে গেলো গ্রামে।

ফোন বা চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ রাখলেও, ধীরে ধীরে সে সম্পর্কটা দুরত্বে ভরে যায়। অর্ণব নিজের ক্যারিয়ারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, আর নীলা গ্রামীণ জীবনের সহজ সরলতায় ডুবে ছিল। কিন্তু অর্ণবের মনে কোথাও এক অদৃশ্য বন্ধন সবসময় টানতো তাকে নীলার দিকে।

আজ বহু বছর পর সে ফিরেছে শুধু নীলার জন্যই। শুনেছে, নীলা এখনও তিস্তার পাড়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় আসে, নদীর জলে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।

অর্ণব হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল সেই পরিচিত বাঁশবনের ধারে। দূরে সত্যিই সে দেখলো নীলা দাঁড়িয়ে আছে। লাল শাড়ি পরা, খোলা চুল বাতাসে উড়ছে, আর চোখ স্থির নদীর জলে।

অর্ণবের বুক ধকধক করে উঠলো। এত বছর পরেও নীলার সৌন্দর্য যেন আরও গাঢ় হয়েছে। সাবধানে এগিয়ে গিয়ে সে ডাকলো—
—“নীলা…”

নীলা চমকে পেছনে তাকালো। চোখে বিস্ময়, ঠোঁটে কাঁপা হাসি।
—“অর্ণব? তুমি… সত্যিই তুমি?”

অর্ণব মৃদু হাসলো।
—“হ্যাঁ নীলা, আমি ফিরেছি। অনেকদিনের পর।”

দু’জনের মাঝে কিছুক্ষণ নীরবতা। বাতাসে শুধু নদীর কলতান। এরপর নীলা ধীরে বললো—
—“তুমি কি জানো, আমি প্রতিদিনই ভেবেছি হয়তো একদিন তুমি ফিরবে? কিন্তু এত বছর কেটে গেলো… আমি ভেবেছিলাম হয়তো তুমি ভুলে গেছো।”

অর্ণব চোখ নামিয়ে মৃদু স্বরে বললো—
—“ভুলিনি নীলা। কখনো না। শহরে থেকেও প্রতিদিন তিস্তার কথা মনে পড়েছে। তোমার কথা মনে পড়েছে।”

নীলার চোখে জল চিকচিক করে উঠলো।
—“তাহলে এতদিন এলে না কেন?”

অর্ণব গভীর নিঃশ্বাস ফেললো।
—“দূরত্ব, দায়িত্ব আর জীবনের টানাপোড়েন… কিন্তু এখন বুঝেছি, এই সব কিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তুমি।”

নীলা নীরব হয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকলো। সূর্য তখন প্রায় অস্ত যাচ্ছে। চারদিকে লাল আভা। হঠাৎ নীলা বললো—
—“তুমি কি জানো, আমি এই নদীর পাড়ে তোমার ফেরার অপেক্ষায় থেকেছি? মনে হয়েছে, একদিন নিশ্চয়ই অর্ণব আসবে। হয়তো দেরি করবে, কিন্তু আসবেই।”

অর্ণব তার হাত ধরে বললো—
—“তাহলে চল নীলা, আজ থেকে নতুন করে শুরু করি। নদীর মতোই আমাদের সম্পর্ক হোক—যত বাঁক আসুক, শেষ পর্যন্ত মিলেমিশে থাকবে।”

নীলার চোখ ভিজে উঠলো। কিন্তু সেই ভেজা চোখেই ফুটে উঠলো সুখের দীপ্তি।
—“আমি রাজি অর্ণব। তবে একটা শর্ত আছে।”

অর্ণব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো—
—“কি শর্ত?”

নীলা হেসে বললো—
—“প্রতিদিন আমাকে এই তিস্তা নদীর পাড়ে নিয়ে আসবে। আমরা একসঙ্গে বসে সূর্যাস্ত দেখবো। যাতে আমাদের ভালোবাসা কখনো শুকিয়ে না যায়।”

অর্ণব হেসে মাথা নাড়লো।
—“শর্ত মঞ্জুর।”

সেদিন সূর্যাস্তের আলোয় দু’জনের হাত এক হয়ে গেল। তিস্তার ঢেউয়ের মতোই তাদের ভালোবাসার স্রোত বয়ে চললো নতুন পথে।

কয়েক মাস পর

অর্ণব আর নীলা গ্রামে বিয়ে করলো। সাদামাটা আয়োজন হলেও তাতে ছিল এক অপার আনন্দ। গ্রামের সবাই জানতো—এই নদীর পাড়ের প্রেম আজ পূর্ণতা পেয়েছে।

অর্ণব শহরের চাকরি ছেড়ে গ্রামের কাছাকাছি এক কলেজে শিক্ষকতা শুরু করলো। নীলা বাড়ির কাজের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের নিয়ে ছোট একটি স্কুল গড়ে তুললো। দু’জন মিলে নতুন স্বপ্নের সংসার গড়ে তুললো।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় তারা দু’জন হাত ধরে হেঁটে যায় তিস্তার পাড়ে। সূর্যাস্ত দেখে, নদীর স্রোতের শব্দ শোনে, আর একে অপরকে মনে করিয়ে দেয়—
“এই নদী যেমন চিরকাল বহমান, আমাদের ভালোবাসাও তেমনি।”

        <><## ><সমাপ্ত>< ##<> 


No comments:

Post a Comment

Powered by Blogger.

Search This Blog

Lorem Ipsum is simply dummy text of the printing and typesetting industry. Lorem Ipsum has been the industry's.

Facebook