Subscribe Us

Friday, September 5, 2025

“চিরন্তন প্রেমের ছায়া”

প্রথম অধ্যায়: বিকেলের আলোয় দেখা

ঢাকার ব্যস্ত শহরের বুকে যেন শান্তির আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রিমা উদ্যান একদিকে সবুজের সমারোহ, অন্যদিকে শান্ত লেকযেন কোলাহল ভরা নগর জীবনে কিছুক্ষণের জন্যও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা। প্রতিদিন এখানে আসে প্রেমিক-প্রেমিকারা, পরিবার, কিংবা একাকী পথিকযারা খুঁজে ফেরে একটু নিরিবিলি সময়।

সে বিকেলে সূর্য ধীরে ধীরে ডুবছিল। পশ্চিম আকাশটা লাল-কমলা রঙে ভরে উঠেছে। ঠিক তখনই, রিফাত প্রথম দেখল নীলাকে।

নীলা বসেছিল লেকের ধারে, হাতে একটা বই। তার চোখ যেন হারিয়ে গিয়েছিল অক্ষরের ভেতর। চারপাশে ভিড় থাকলেও, তাকে দেখলে মনে হচ্ছিলএই বিশাল পৃথিবীতে সে একাই রয়েছে, কেবল বই- তার সঙ্গী।

রিফাত সেই মুহূর্তেই কিছু একটা অনুভব করলএক অদ্ভুত টান। সে নিজেই অবাক হয়ে গেল। জীবনে এর আগে এমন অনুভূতি হয়নি।

একটা চেয়ার খালি আছে?”— ধীর কণ্ঠে বলল রিফাত।

নীলা বই থেকে চোখ তুলে তাকাল। তার চোখদুটি যেন গভীর হ্রদের মতোঅসীম শান্ত, তবু অজানা রহস্যে ভরা। হালকা মৃদু হাসি দিয়ে মাথা নাড়ল।

সেদিনের দেখা, আস্তে আস্তে নিয়মিত হয়ে গেল।

দ্বিতীয় অধ্যায়: বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা

চন্দ্রিমা উদ্যান যেন তাদের গল্পের নীরব সাক্ষী হয়ে উঠল। প্রতিদিনই তারা বিকেলের দিকে সেখানে আসত।

নীলা লেকের পাড়ে বসে কবিতা পড়তে ভালোবাসত, আর রিফাত ছবি তুলত। কখনো তারা হাঁটত ফুলের বাগানের ভেতর দিয়ে, কখনো পাথরের বেঞ্চে বসে চুপচাপ সূর্যাস্ত দেখত।

একদিন হঠাৎ রিফাত বলল
তুমি জানো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস কী?”নীলা হেসে উত্তর দিল

তুমি নিশ্চয়ই বলবে সূর্যাস্ত বা ফুলের সৌন্দর্য।

রিফাত মাথা নাড়িয়ে বলল
না। সবচেয়ে সুন্দর জিনিস হলো দুজন মানুষের একে অপরকে নিঃশব্দে বোঝা যেমন এখন আমরা।

নীলার মুখে অকারণ এক লাল আভা ছড়িয়ে পড়ল। সেই মুহূর্তে তার বুকের ভেতরও যেন কেঁপে উঠল কোনো অদৃশ্য তার।

তৃতীয় অধ্যায়: প্রেমের প্রথম প্রকাশ

দিন গড়িয়ে যায়, ঋতু বদলায়। বর্ষার দিনে তারা দুজনে ছাতার নিচে ভিজেছিল, শীতে গরম চা খেতে খেতে জমে থাকা কুয়াশার ভেতর হারিয়েছিল।

একদিন শরতের বিকেলে, সাদা কাশফুলে ভরা উদ্যান। চারপাশে হালকা বাতাস, পাখির কলতান। রিফাতের হাতে ছোট্ট একটা গোলাপ।

নীলা…”— সে ফিসফিস করে বলল।

নীলা চমকে তাকাল।

আমার মনে হয়, তুমি ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। প্রতিদিনের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনাসবকিছু তোমার সাথে ভাগাভাগি করতে চাই। তুমি কি আমার হবে?”

নীলা কিছুক্ষণ নীরব রইল। বুকের ভেতর ঢেউ খেলল। চোখে জমে থাকা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল গালে।

হ্যাঁ রিফাত, আমি তো অনেকদিন ধরেই তোমার।

চন্দ্রিমা উদ্যানে সূর্যাস্তের লাল রঙের সঙ্গে মিশে গেল তাদের প্রথম ভালোবাসার স্বীকারোক্তি।

চতুর্থ অধ্যায়: পরীক্ষার দিনগুলো

ভালোবাসা যতই মধুর হোক, জীবনের বাস্তবতা সবসময় তা সহজ রাখে না। রিফাত পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অন্যদিকে নীলার পরিবার চেয়েছিল সে দ্রুত বিয়ে করুক, বিদেশে থাকা এক আত্মীয়ের সঙ্গে।নীলা অনেকবার বুঝিয়েছে

আমি রিফাত ছাড়া কাউকে কল্পনাও করতে পারি না।

কিন্তু পরিবার কঠোর। নীলার বাবা বললেন
তোমরা কি শুধু উদ্যানে বসে গল্প করলেই জীবন চলবে? সংসার গড়তে হলে বাস্তবতা বুঝতে হবে।

এই কথা নীলার হৃদয়কে বিদ্ধ করল।

রিফাতও একদিন ক্লান্ত হয়ে বলল
হয়তো আমি তোমাকে যথেষ্ট নিরাপত্তা দিতে পারব না, নীলা। তোমার পরিবার হয়তো ঠিকই বলছে।

নীলা রাগে কেঁপে উঠল
তুমি কি ভাবো, আমি শুধু আরাম-আয়েশ চাই? না রিফাত, আমি শুধু তোমাকেই চাই।

চোখের জলে ভিজে গেল তাদের কথোপকথন।

পঞ্চম অধ্যায়: বিচ্ছেদের ছায়া

চাপের কাছে হার মানল ভালোবাসা। নীলার পরিবার জোর করে বিয়ের আয়োজন শুরু করল। একরাতে সে শেষবারের মতো রিফাতকে দেখা করতে ডেকে পাঠাল চন্দ্রিমা উদ্যানে।

বৃষ্টি হচ্ছিল। লেকের পানিতে ঢেউ, আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানি। নীলা ভিজে যাচ্ছিল তবুও দাঁড়িয়ে ছিল।

রিফাত, যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তুমি মনে রেখোআমি সবসময় তোমারই ছিলাম।

রিফাত ছুটে গিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরল।
না নীলা! তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। আমি লড়ব, আমি প্রমাণ করব আমাদের ভালোবাসা বাস্তব।

কিন্তু নীলা মাথা নাড়ল।
কখনো কখনো ভালোবাসা মানে শুধু একসাথে থাকা নয়, প্রিয়জনের জন্য ত্যাগ করাও ভালোবাসা।

এই বলে সে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।

ষষ্ঠ অধ্যায়: শূন্যতার দিন

নীলার বিয়ের দিন রিফাত দূরে বসে ছিল। ভাঙা হৃদয়ে সে শপথ করলচন্দ্রিমা উদ্যানেই তার ভালোবাসার সব স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখবে।

প্রতিদিনই সে আসত উদ্যানে। লেকের ধারে বসত, ফুলের বাগানে হাঁটত, আর কল্পনা করত নীলার মুখ। তার তোলা ছবিগুলোতে নীলার ছায়া লেগেই থাকত।

বছর ঘুরে গেল। মানুষ বলত—“সময় সব ক্ষত সারিয়ে দেয়।কিন্তু রিফাতের মনে ক্ষত আরও গভীর হতো।

সপ্তম অধ্যায়: অনাকাঙ্ক্ষিত পুনর্মিলন

একদিন বসন্তের সকালে, উদ্যানে হঠাৎ করেই রিফাত দেখলনীলা!

নীলা বিদেশে যাওয়ার পর আবার ফিরে এসেছে। তার চোখে ক্লান্তি, ঠোঁটে নিঃশ্বাসবিহীন হাসি।

তুমি?”— রিফাত অবাক।

নীলার চোখে জল ভেসে উঠল।
রিফাত, আমি সুখী হতে পারিনি। পরিবার যা চেয়েছিল, তা করেছি, কিন্তু হৃদয় তোমার কাছেই রয়ে গেছে।

দুজনের চোখে অশ্রুর ঢেউ। মনে হচ্ছিল, এতদিনের শূন্যতা যেন এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।

অষ্টম অধ্যায়: নতুন ভোর

চন্দ্রিমা উদ্যানে তারা আবারও বসে থাকল, আগের মতোই। চারপাশে ফুল ফুটেছে, লেকের পানিতে আলো ঝলমল করছে।

রিফাত নীলার হাত ধরল
এবার আর কাউকে আমাদের আলাদা করতে দেব না। জীবন যত কঠিনই হোক, আমরা একসাথে থাকব।

নীলা মৃদু হেসে মাথা রাখল রিফাতের কাঁধে।
হ্যাঁ রিফাত, এবার আমরা একে অপরের ছায়া হয়ে থাকব।

<> <> <> সমাপ্ত <> <> <>
 

1 comment:

Powered by Blogger.

Search This Blog

Lorem Ipsum is simply dummy text of the printing and typesetting industry. Lorem Ipsum has been the industry's.

Facebook